ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও দুই দেশের অবস্থানে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পাল্টাপাল্টি দাবিতে স্পষ্ট হয়েছে, কূটনৈতিক অচলাবস্থা পুরোপুরি কাটেনি।

বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, আলোচনার বিনিময়ে ইরানকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, “আমরা কোনো নিষেধাজ্ঞা ছাড় বা অর্থ দেওয়ার কথা বলছি না।”

একই দিনে পিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করতে হবে। তার ভাষায়, “তারা তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দেবে। এটি কোনো নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের বিনিময়ে নয়।”

এর আগে তিনি বলেছিলেন, ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, নয়তো আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করতে হবে।

তবে তেহরান এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইরান জানিয়েছে, তাদের কাছে মজুত থাকা প্রায় ৪৪০ কেজি পারমাণবিক উপাদান তারা কোনোভাবেই ছাড়বে না।

পারমাণবিক ইস্যুর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ইরানের বন্দর ঘিরে মার্কিন নৌ অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রশ্ন।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটি দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে তিনি নতুন সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিতও দেন। তার ভাষায়, “আমরা এতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। প্রয়োজন হলে কাজ শেষ করতেও হবে।”

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। ওই হামলায় ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সামরিক নেতা নিহত হন। পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েল ও অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করে।

বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে হওয়ায় এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়ে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে বিভিন্ন দেশে।

এদিকে বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন একটি সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকের তথ্য প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ তুলে নেয়, তাহলে যুদ্ধপূর্ব অবস্থার মতো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে সামরিক জাহাজ এই চুক্তির আওতার বাইরে থাকবে এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু হোয়াইট হাউস সঙ্গে সঙ্গেই ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যে সমঝোতা স্মারকের কথা বলছে, সেটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া।

ট্রাম্পও স্পষ্ট করে বলেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর একক নিয়ন্ত্রণ কোনো দেশের হাতে থাকতে পারে না। তার মতে, এটি আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র নজরদারি চালিয়ে যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ—এই দুই ইস্যুই এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও পূর্ণাঙ্গ সমাধান এখনো অনিশ্চিত।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version