
Vladimir Putin চীনে পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump–এর সফরের মাত্র চার দিন পর। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল কাকতালীয় নয়; বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতেই বেইজিং এই কূটনৈতিক বার্তা দিচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বর্তমানে মস্কো অর্থনীতি ও প্রযুক্তির জন্য অনেকটাই বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা বাড়ায় নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাশিয়ার স্থলপথের গ্যাস ও তেলের দিকে ঝুঁকছে চীন।
পুতিন-শি বৈঠক কেন গুরুত্বপূর্ণ
চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping–এর সঙ্গে এক বছরের কম সময়ের মধ্যে এটি পুতিনের দ্বিতীয় সরাসরি বৈঠক। এই সফরের সময়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
বেইজিংয়ে পৌঁছানোর পর পুতিনকে স্বাগত জানান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Wang Yi। পরে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ছোট ও বড় পরিসরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা দুই দেশকে আরও কাছে এনেছে
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা রাশিয়া ও চীনকে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের জন্য এটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তাই সমুদ্রপথের ঝুঁকি এড়িয়ে রাশিয়ার স্থলপথভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে বেইজিং।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব
একসময় চীন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক ছিল গভীর সন্দেহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভরা। শীতল যুদ্ধের সময় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সীমান্তই এখন দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডরে পরিণত হয়েছে। পুতিন ও শি জিনপিং একে অপরকে প্রকাশ্যে “বন্ধু” বলে সম্বোধন করেন। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
রাশিয়ার কাছে চীন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতি বড় চাপের মুখে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে চীন হয়ে ওঠে মস্কোর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ভরসা।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বেড়ে ২৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে রাশিয়ার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিপণ্যের ৯০ শতাংশের বেশি চীন থেকে আসছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের অন্যতম বড় ক্রেতাও এখন চীন।
তবে সম্পর্কটি পুরোপুরি সমান নয়। চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ৪ শতাংশ রাশিয়ার সঙ্গে। ফলে আলোচনায় বেইজিংয়ের প্রভাব ও দরকষাকষির ক্ষমতা অনেক বেশি।
চীনের কাছে রাশিয়া কেন দরকার
চীনের জন্য রাশিয়া মানে নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ায় ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং। এই পাইপলাইন চালু হলে মঙ্গোলিয়া হয়ে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরাসরি চীনে পৌঁছাবে।
শুধু অর্থনীতি নয়, ভূরাজনীতিতেও রাশিয়া চীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দুই দেশ প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নেয়। এছাড়া নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়াও পরিচালনা করছে তারা, যদিও আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে এখনো যায়নি চীন।
সম্পর্ক কি সহজে ভাঙবে?
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-চীনের বর্তমান সম্পর্ক শুধু পশ্চিমবিরোধিতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং বাস্তব অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও কৌশলগত স্বার্থ এই সম্পর্ককে শক্ত ভিত দিয়েছে। তাই ভবিষ্যতে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হলেও দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা সহজে কমবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সফরে পুতিনও বলেছেন, রাশিয়া ও চীন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। বর্তমান বিশ্বের অনিশ্চয়তায় এই দুই শক্তিধর দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
