২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংস সামরিক অভিযানের মুখে লাখো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মানবিক বিবেচনায় তাদের আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু প্রায় এক দশক পর এসে রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু মানবিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে Cox’s Bazar–এর উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক হামলা, গুলিবর্ষণ, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের খবর সামনে এসেছে। এতে ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, রাষ্ট্রহীনতা ও সীমিত সুযোগের মধ্যে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সহজেই অপরাধী বা সশস্ত্র নেটওয়ার্কের প্রভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৫ সালে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত তীব্র হওয়ার সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কিছু রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। যদিও এ ধরনের ঘটনার পরিমাণ সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তবুও বিষয়টি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ পায়, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক নয়, বরং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী নিরাপত্তা ইস্যুতেও রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হতাশা বাড়ছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয় ব্যবস্থাপনায় সহায়তা অব্যাহত রাখলেও প্রত্যাবাসনের কার্যকর রূপরেখা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন নতুন সংকট সামনে আসায় রোহিঙ্গা ইস্যুর আন্তর্জাতিক গুরুত্বও আগের তুলনায় কমে গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে এবং ক্যাম্পভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মসূচিও সংকুচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত থাকলে বাংলাদেশে এমন একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা জন্ম থেকেই শরণার্থী শিবিরে বড় হচ্ছে এবং মিয়ানমার সম্পর্কে বাস্তব কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

তাদের মতে, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। কার্যকর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ, মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত প্রত্যাবাসনের বাস্তব উদ্যোগই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।

লেখক: Abu Ahmed Faizul Kabir

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version