আরবি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটিকে পবিত্র শবে বরাত বলা হয়। ইসলামে ভালো বা খুশির সংবাদে মিষ্টি মুখ করার একটি সাধারণ সংস্কৃতি রয়েছে। শবে বরাতকে যেহেতু গুনাহ মাফের এবং ভাগ্য নির্ধারণের রাত হিসেবে গণ্য করা হয়, তাই আনন্দ ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মানুষ মিষ্টি জাতীয় খাবার বা হালুয়া তৈরি শুরু করে।
এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, এ রাতে আল্লাহ তার সঙ্গে শিরককারী ও হিংসুক ছাড়া সব সৃষ্টিকে ক্ষমা করেন। এই রাতে মানুষজন বিভিন্ন ধরনের নফল ইবাদত পালন করে থাকেন। ইবাদতের পাশাপাশি শবে বরাত উপলক্ষে হালুয়া রুটি খাওয়ারও প্রচলন রয়েছে অনেকের মাঝে।
তবে শবে বরাতে হালুয়া-রুটি খাওয়ার কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বা সরাসরি ধর্মীয় নির্দেশনা নেই। নবীজি কিংবা সাহাবিদের যুগে শবে বরাত বা লাইলাতুম মিন নিসফি শাবানকে কেন্দ্র করে হালুয়া রুটি খাওয়া বা প্রতিবেশীদের মাঝে বিলানোর কোনও প্রচলন ছিলো বলে হাদিসে সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও বাংলাদেশে ১৯’শ শতকের শেষের দিকে শবে বরাত পালনের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয় বলে মতামত দিয়েছেন অনেক ইতিহাসবিদ।
আবার কিছু কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, ওহুদের যুদ্ধে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাঁত মোবারক শহীদ হয়েছিল। তখন তিনি নরম খাবার হিসেবে হালুয়া খেয়েছিলেন। সেই ঘটনার স্মরণে অনেকে হালুয়া-রুটি তৈরি করেন। তবে আধুনিক ইসলামিক গবেষকদের মতে, ওহুদের যুদ্ধ শাবান মাসে নয় শাওয়াল মাসে হয়েছিল।
সে যাই হউক, শবে বরাতের হালুয়া-রুটি এখন যে এক সামাজিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সারা দেশেই এর প্রচলন রয়েছে। আবার কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে পারস্য (বর্তমান ইরান) এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সংস্কৃতির প্রভাব বাংলায় আসার পর এই হালুয়া-রুটির প্রচলন আরও বৃদ্ধি পায়।
বিশেষ করে মুঘল আমলে এটি একটি বিশেষ আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আগেকার দিনে পাড়া-প্রতিবেশী এবং দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিলিয়ে দেওয়ার একটি সহজ উপায় ছিল রুটি ও হালুয়া। এটি দীর্ঘক্ষণ ভালো থাকে এবং সহজে বণ্টন করা যায়, যা থেকে এই রীতিটি একটি উৎসবে রূপ নেয়।
সুজি, বুট, গাজর, ডিম, বাদাম, পেঁপে, চালকুমড়া, নেসেস্তাসহ হরেক রকমের উপকরণ দিয়েই বৈচিত্র্যময় স্বাদের হালুয়া তৈরি করা যায়। করবেনও অনেকে। তবে হালুয়া নামের এই মিষ্টির উৎপত্তি কবে কোথায়, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বর্তমানে এটি ধর্মীয় আমলের চেয়েও একটি জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
