মাত্র ২৮ বছর বয়সে নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে সবচেয়ে কনিষ্ঠ ‘ফার্স্ট লেডি’ হতে যাচ্ছেন রমা দুয়াজি। গত মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) রাতে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জয়লাভ করছেন তার স্বামী জোহরান মামদানি।
সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি শপথ নেবেন জোহরান মামদানি। তিনি হবেন নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম, ভারতীয় বংশোদ্ভূত, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্ম নেয়া এবং ১৮৯২ সালের পর সবচেয়ে কম বয়সি মেয়র। একই সঙ্গে রমা হবেন নিউইয়র্কের ফার্স্ট লেডি।
বিজয় ভাষণে মামদানি তার স্ত্রীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন ‘আমার অসাধারণ স্ত্রী, রমা এই মুহূর্তে এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, আমি তার চেয়ে বেশি আর কাউকে পাশে চাই না।’
রমা দুয়াজি সিরিয়ান বংশোদ্ভূত একজন নিউইয়র্ক-ভিত্তিক শিল্পী, যার কাজ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে। তার শিল্পকর্ম প্রকাশিত হয়েছে বিবিসি নিউজ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ভাইস এবং লন্ডনের টেট মডার্ন মিউজিয়ামে।
মে মাসে এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে মামদানি লিখেছিলেন, ‘রমা শুধু আমার স্ত্রী নন; তিনি একজন অসাধারণ শিল্পী, যার নিজস্ব পরিচিতি প্রাপ্য।’ সে সময়ই তিনি জানান, তারা তিন মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। দুজনের দেখা হয়েছিল ডেটিং অ্যাপ হিঞ্জ-এ। মামদানি পরে রসিকতা করে বলেন, ‘তাহলে ডেটিং অ্যাপগুলোতেও এখনো কিছুটা আশা আছে।’
নির্বাচন প্রচারের শুরুর দিকে রমা খুব একটা জনসমক্ষে আসেননি, ফলে প্রতিপক্ষরা অভিযোগ তোলে যে মামদানি তার স্ত্রীকে ‘আড়াল’ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রার্থীরা সাধারণত পারিবারিক মূল্যবোধ তুলে ধরতে জীবনসঙ্গীকে প্রকাশ্যে আনে।এ কারণে রমার অনুপস্থিতি সেসময় অনেকের নজর কাড়ে।
তবে মে মাসের এক পোস্টে মামদানি সেই সমালোচনার জবাব দেন। তিনি নিউইয়র্ক সিটি ক্লার্কের অফিসে তাদের বিয়ের কিছু ছবি প্রকাশ করেন এবং লেখেন, ‘আপনি যদি আজ টুইটারে যান, বুঝবেন রাজনীতি কতটা নির্মম হতে পারে। মৃত্যুর হুমকি বা বহিষ্কারের ডাক আমি সাধারণত উপেক্ষা করি, কিন্তু যখন প্রিয়জনদের নিয়ে কথা ওঠে, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। আমার মতাদর্শের সমালোচনা করুন, কিন্তু আমার পরিবারকে নয়।’
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রমা যদিও আলোচনার আড়ালে থেকেছেন, তবু প্রচারণার নকশা, রঙ ও টাইপফেস তৈরিতে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী।
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে জন্ম নেয়া রমা নয় বছর বয়সে পরিবারসহ দুবাই চলে যান, পরে কিছুদিন কাতারে পড়াশোনা করেন। আরবি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, তার বাবা-মা সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের মুসলিম বাসিন্দা।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাক্ষাৎকারে রমার এক বন্ধু হাসনাইন ভাট্টি বলেন, ‘তিনি আমাদের সময়ের আধুনিক প্রিন্সেস ডায়ানা।’
অন্য বন্ধুরা জানিয়েছেন, ‘রমা বর্তমানে উচ্ছ্বসিত হলেও তাকে নিয়ে হওয়া অতিরিক্ত আলোচনার ফলে খানিকটা ক্লান্ত বোধ করছেন।’
রমা ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং নিউইয়র্কের স্কুল অব ভিজ্যুয়াল আর্টস থেকে ইলাস্ট্রেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার ওয়েবসাইটে লেখা আছে: ‘প্রতিকৃতি ও গতিশীল চিত্রের মাধ্যমে রামা ভ্রাত্রত্ব ও সামষ্টিক অভিজ্ঞতার সূক্ষ্ম দিকগুলো অনুসন্ধান করেন’। তার বেশিরভাগ কাজ সাদা-কালো, যেখানে আরব বিশ্বের দৃশ্য ফুটে ওঠে।
নিউইয়র্ক টাইমসকে প্রচার দলের এক মুখপাত্র বলেন, রমা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলেও জাতিগতভাবে সিরিয়ান। ২০২২ সালে তার শিল্পকর্ম অন্তর্ভুক্ত হয় বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস-এর প্রামাণ্যচিত্র ‘হু কিলড মাই গ্র্যান্ডফাদার’-এ, যা ১৯৭৪ সালে এক ইয়েমেনি রাজনীতিকের হত্যাকাণ্ড তদন্ত করে।
এছাড়াও তার কিছু শিল্পকর্মে দেখা যায় আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা, ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধের নিন্দা এবং ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নিধন’ বিরোধী বক্তব্য—যার অনেকাংশে মামদানির রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন ঘটে। রমা তার শিল্পে ফিলিস্তিনপন্থি কর্মী মাহমুদ খালিলের পক্ষেও সমর্থন জানিয়েছেন। যাকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ইহুদি বিদ্বেষ’ এর অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের চেষ্টা করছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
