শীতের শুরুতেই ভয়াবহ বায়ুদূষণ মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। দূষণ নিয়ন্ত্রণে শীতকালীন কর্মপরিকল্পনা কার্যকরের প্রথম দিনেই প্রায় ১৫ হাজার যানবাহন পরীক্ষা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে ১ হাজার ৫৩৯টি গাড়িকে দিল্লিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধে মোট ৬৮ দশমিক ৪ লাখ রুপি জরিমানা ও পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে।
সোমবার, ২ নভেম্বর, প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে এনডিটিভি।
দিল্লির পরিবেশ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৫টা পর্যন্ত যানবাহন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শনাক্ত হয়। এর মধ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সনদ বা পিইউসি সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের জন্য ৫৬ দশমিক ৬ লাখ রুপি জরিমানা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দিল্লিতে প্রবেশের চেষ্টায় ২ লাখ রুপি এবং নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট ধূলিদূষণের জন্য ৯ দশমিক ৮ লাখ রুপি পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়।
দূষণ নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত বিএস-৬ মানের নিচের যানবাহনের প্রবেশে বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। এ অভিযানে দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহন বিভাগের সদস্যরা মোট ১৪ হাজার ৯৩০টি যানবাহন পরীক্ষা করেন।
পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ যানবাহন নিয়মের আওতায় পড়েছে। মোট ১ হাজার ৫৩৯টি গাড়িকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল ১৪০টি হালকা মোটরযান, ৫৪টি হালকা বাণিজ্যিক গাড়ি, ৯৫টি ভারী পণ্যবাহী যান এবং ৩৪টি বাস।
এ ছাড়া দুই ও তিন চাকার ১ হাজার ৪২৩টি যানবাহন পরীক্ষা করে ৭৮৯টিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আটক করা হয় আরও ৩৮টি যান।
অন্যদিকে, নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই চলাচলকারী ৭ হাজার ২৭৯টি যানবাহনের মধ্যে ৩১৪টিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চালান জারি করা হয়নি। তবে অন্যান্য অনিয়মের ঘটনায় ১২৭টি চালান জারি এবং ৬২টি যানবাহন বাজেয়াপ্ত করা হয়। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ২ লাখ রুপি জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে পরিবেশবান্ধব ও জরুরি যানবাহনের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের পর সিএনজি, বৈদ্যুতিক যান এবং জরুরি সেবায় ব্যবহৃত ৭৪০টি গাড়িকে দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
বৈধ দূষণ নিয়ন্ত্রণ সনদ ছাড়া গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে। এ অপরাধে মোট ৫৬৬টি চালান জারি করা হয়। এর মধ্যে ট্রাফিক পুলিশ ৪৯৩টি চালানের বিপরীতে ৪৯ দশমিক ৩ লাখ রুপি এবং পরিবহন বিভাগ ৭৩টি চালানে ৭ দশমিক ৩ লাখ রুপি জরিমানা ধার্য করেছে।
যানবাহনের পাশাপাশি নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট ধূলিদূষণ নিয়ন্ত্রণেও অভিযান চালিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মোট ৩০০টি নির্মাণ ও ধ্বংসস্তূপ ব্যবস্থাপনার স্থান পরিদর্শন করে ৩২টি স্থানে বিধি লঙ্ঘনের তথ্য পাওয়া যায়। বড় নির্মাণস্থলগুলোর মধ্যে ১৬টি স্থানে অনিয়ম শনাক্ত করা হয়। এসব ক্ষেত্রে দুটি স্থাপনা বন্ধের নির্দেশ, চারটি কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ৪ লাখ রুপি পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে।
ছোট নির্মাণস্থলগুলোর মধ্যে ২০৯টি পরিদর্শন করে ১৭টিতে অনিয়ম পাওয়া যায়। এসব স্থানের বিরুদ্ধে ১৫টি বন্ধের নির্দেশ, ১৫টি কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ৫ দশমিক ৮ লাখ রুপি জরিমানা ধার্য করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্মাণ ও ধূলিদূষণ নিয়ন্ত্রণে ১৭টি আংশিক বন্ধের নির্দেশ, ১৯টি কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ৯ দশমিক ৮ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। তবে ছাড়প্রাপ্ত সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দিল্লির পরিবেশমন্ত্রী মনজিন্দর সিং সিরসা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রথম দিনেই প্রায় ১৫ হাজার যানবাহন পরীক্ষা, পিইউসি বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ৫৬৬টি চালান এবং ৩০০টি নির্মাণস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে।
যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ সনদ বৈধ রাখা, প্রবেশসংক্রান্ত বিধিনিষেধ মেনে চলা এবং নির্মাণস্থলে ধূলিদূষণ প্রতিরোধের নিয়ম অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি। পরিচ্ছন্ন বাতাস নিশ্চিত করতে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন পরিবেশমন্ত্রী।
দিল্লির শীতকালীন দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা ১ নভেম্বর থেকে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে কার্যকর থাকবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত বিএস-৬ মানের নিচের যানবাহনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। নির্দিষ্ট সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের বাইরে অন্যান্য উন্মুক্ত নির্মাণকাজ ও ধূলি সৃষ্টি করে এমন কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশও রয়েছে।
এ ছাড়া ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ ছাড়ের আওতায় না থাকা নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দূষণ কমাতে শহরের পার্কিং ফি দ্বিগুণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি অফিসে ৫০ শতাংশ কর্মীর সশরীরে উপস্থিতির নিয়ম চালু করা হয়েছে।
শীতের মৌসুমে দিল্লির বাতাসের মান আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখন দেখার বিষয়, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে বিধিনিষেধ এবং জরিমানার মাধ্যমে রাজধানীর দূষণ পরিস্থিতি কতটা উন্নত করা সম্ভব হয়।
