পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদারত্ব ও দক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে পুলিশকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে শিক্ষানবিশ পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম সার্জেন্ট এবং ৪৩তম সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ব্যাচের ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা ও পেশাদারত্ব বজায় রাখতে হবে। সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী পরিচালনার জন্য চেইন অব কমান্ড, পারস্পরিক সমন্বয়, আনুগত্য ও কার্যকর নেতৃত্ব অপরিহার্য। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি জনগণকে জনবান্ধব পুলিশি সেবার অভিজ্ঞতা দিতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দেশ বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নবীন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশি। পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার পাশাপাশি নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা এবং জ্যেষ্ঠতাকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে স্বাধীন ও শক্তিশালী পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান তিনি।
নবীন পুলিশ সদস্যদের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্রিটিশ আমলের পুলিশ আইন পরিবর্তন করে বর্তমান সময়ের উপযোগী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের দায়িত্ব হবে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করা।
দুর্নীতি ও সাইবার অপরাধ দমনে গুরুত্ব
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নবীন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। নাগরিকদের প্রতি দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি এবং আইনের প্রতি অবিচল আস্থা তাঁদের পেশাগত জীবনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও কঠোর বার্তা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মাদক নির্মূলে পুলিশকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তাঁর ভাষ্য, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর প্রভাব পরিবার, সমাজ ও পুরো দেশের ওপর পড়ে। তাই মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
প্রশিক্ষণ শেষ করলেন ২৪৬ জন পুলিশ কর্মকর্তা
অনুষ্ঠানে ২৭তম সার্জেন্ট ব্যাচের ৮৪ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন। তাঁরা সবাই পুরুষ। অন্যদিকে ৪৩তম এসআই ব্যাচের ১৬২ জনের মধ্যে পাঁচজন নারী এবং ১৫৭ জন পুরুষ ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যারেড পরিদর্শন করেন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে প্রশিক্ষণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনকারী আটজনের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন তিনি।
বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির অধ্যক্ষ মাইনুল হাসান বিপিএম, পিপিএম, এনডিসির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
চাকরিচ্যুতির পর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেন ২৪৬ জন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৭ সালে তৎকালীন সরকারের সময়ে বিভিন্ন কারণে ১২০ জন সার্জেন্ট এবং ২০৭ জন সাব-ইন্সপেক্টরসহ মোট ৩২৭ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং পুনর্বাসন যাচাই কমিটির পর্যালোচনা শেষে তাঁদের মধ্য থেকে ৮৪ জন সার্জেন্ট ও ১৬২ জন সাব-ইন্সপেক্টর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। এসআইদের মধ্যে পাঁচজন নারী এবং ১৫৭ জন পুরুষ রয়েছেন।
প্রশিক্ষণ শেষ করা এসব কর্মকর্তা বিভিন্ন কর্মস্থলে যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীতে পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নবীন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
