বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সমস্যা, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সমাধানের উদ্যোগে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ তথ্য জানিয়েছেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর মিন্টো রোডে ২৯ নম্বর সরকারি বাসভবনে জামায়াত আমিরের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় গোলাম পরওয়ার বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন।
তিনি জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা নিজেদের বিভিন্ন সমস্যা, অসুবিধা, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিষয়গুলো বৈঠকে তুলে ধরেছেন। এসব বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য শোনার পর জামায়াত আমির সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও তাঁদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, মতবিনিময় সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, পূজা উদযাপন ফ্রন্ট, জাতীয় হিন্দু মহাজোট এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিনিধিসহ আরও কয়েকটি সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বিরোধীদলীয় নেতার সাংবিধানিক দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পায় বলে জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, দেশের সব ধর্মের মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও এসব বিষয়ে কথা বলা এবং দায়িত্ব পালন করার সাংবিধানিক কর্তব্য রয়েছে। বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমান সেই দায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে উপস্থিত নেতাদের অবহিত করেছেন।
গোলাম পরওয়ার আরও জানান, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পূজা উদযাপন ও মন্দিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন, সেগুলোর প্রশংসা করেছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া হিন্দু নেতারা। তাঁদের মতে, ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন আয়োজন নিশ্চিত করতে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মতবিনিময় সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন এলাকার সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে বৈষম্য, বঞ্চনা, নানা ধরনের অসুবিধা এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে ভোগান্তির বিষয় উঠে আসে। এসব সমস্যা সমাধানে তাঁরা সহযোগিতা চান। জবাবে জামায়াত আমির সরকার ও বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা শোনা হবে। দেশের সব নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনে তাঁদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সভা শেষে বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী। তিনি জানান, শারদীয় দুর্গোৎসবের আগে সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগকে তাঁরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। এ জন্য জামায়াতে ইসলামীর আমিরের প্রতি সনাতন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
সুব্রত চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সব ধর্ম ও মতের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। দলীয় পরিচয় কিংবা ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই যেন পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, জামায়াত আমিরের বক্তব্য ও উদ্যোগে তাঁরা সন্তুষ্ট। ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তাঁরা আশা করেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসঙ্গ তুলে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ধর্মীয় উৎসবের সময় রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই বাংলাদেশকে সম্প্রীতির দেশ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে এই সম্প্রীতি আরও শক্তিশালী করতে সমাজের সর্বস্তরে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে মসজিদের খুতবায় মুসলিম ধর্মীয় নেতারা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সম্প্রীতির আহ্বান জানালে তা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সব মিলিয়ে, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জামায়াত আমিরের এই মতবিনিময় সভায় অধিকার, নিরাপত্তা, বৈষম্য দূরীকরণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এসব বিষয়ে দেওয়া আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের পদক্ষেপ ও সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানের ওপর।
