ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমানে দুই পাইলটের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনায় নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। ফ্লাইটটির ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে তার কো-পাইলট হামাম আল-হামামি আক্রমণ করেছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রসিকিউটর জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, কো-পাইলট জরুরি ব্যবহারের কুঠার দিয়ে ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।
ঘটনাটি ঘটে বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটে। দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করা বোয়িং ৭৩৭ বিমানে মোট ১৭৪ জন ছিলেন। উড্ডয়নের পর বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠেছিল। পরে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে উড়োজাহাজটির উচ্চতায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। এক পর্যায়ে বিমানটি অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।
ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের পরবর্তী বর্ণনা অনুযায়ী, শুরুতে তিনি বুঝতে পারেননি ঠিক কী ঘটছে। আকস্মিকভাবে আঘাত পাওয়ার পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করেন তিনি। আহত অবস্থায় ককপিটের মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় তিনি অনুভব করেন, বিমানটি দ্রুত নিচের দিকে যাচ্ছে।
তখন নিজের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি বিমানে থাকা অন্য যাত্রীদের নিরাপত্তার কথাও মাথায় আসে তার। মাচ্ছারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বুঝতে পারেন ককপিটের দরজা খুলে যাত্রীদের ভেতরে ঢুকতে দিতে পারলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত আহত অবস্থাতেই দরজার কাছে পৌঁছে সেটি খুলতে সক্ষম হন তিনি।
দরজা খোলার পর কয়েকজন যাত্রী দ্রুত ককপিটে প্রবেশ করেন। তারা হামামিকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেন। যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুনের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ককপিটে ঢুকে কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের কাছে দেখতে পান। পরে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং অন্যরা মিলে তাকে বেঁধে ফেলেন।
এ সময় বিমানটি এখনও বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল। হায়ুন জানান, হামামিকে সরানোর পর তিনি দেখতে পান উড়োজাহাজটি নিচের দিকে যাচ্ছে। তখন তিনি কন্ট্রোল ধরে বিমানটিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেন। পরে বিমানে থাকা দুজন অফ-ডিউটি পাইলট পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেন। শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ককপিটে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর বিমানটির উচ্চতায় ব্যাপক ওঠানামা হয়। এক পর্যায়ে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়। পরে বিমানটি আবার উচ্চতা পরিবর্তন করে এবং শেষ পর্যন্ত তাবুকে অবতরণ করে।
ঘটনার পর ক্যাপ্টেন মাচ্ছারসহ দুই পাইলটকেই চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। ক্যাপ্টেনের শরীরে একাধিক আঘাতের কথা জানা গেছে। অন্যদিকে বিমানে থাকা যাত্রীদের কেউ গুরুতর আহত হননি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর কো-পাইলট হামাম আল-হামামির অতীত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ওমানের নাগরিক এবং এর আগে ওমানে তার উড্ডয়নসংক্রান্ত ক্যারিয়ার নিয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ ছিল। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উগ্রপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ততার আশঙ্কায় তাকে ওমানে উড্ডয়ন থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। তবে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের সরকারি পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি এবং তার প্রকৃত উদ্দেশ্যও তদন্তাধীন।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামামির পরিচয় ও অতীত নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এলেও তার পরিচয় বা মতাদর্শ সম্পর্কে সব দাবির আনুষ্ঠানিক স্বাধীন নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা ঘটনাটি তিনি একাই ঘটিয়েছেন কি না কিংবা এর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রসিকিউটর জেনারেল ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে একই সঙ্গে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ঘটনার উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা এবং অন্যান্য পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত হামলার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য বা সংগঠনের সম্পৃক্ততাকে নিশ্চিতভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না।
ঘটনাটি ইসরায়েলগামী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বিশেষ করে বিমানের ককপিটে দায়িত্ব পালনকারী পাইলটদের অতীত, নিরাপত্তা যাচাই এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মাঝ আকাশে যখন বিমানটি দ্রুত নিচে নামছিল, তখন আহত ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের ককপিটের দরজা খোলার সিদ্ধান্তই পরিস্থিতি বদলে দেয়। যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারী কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং পরে অন্য পাইলটরা উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। এর ফলে ১৭৪ আরোহী নিয়ে বিমানটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নিরাপদে সৌদি আরবে অবতরণ করতে সক্ষম হয়।
ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য, হামামির পূর্বপরিচিতি এবং তার কর্মকাণ্ডের পেছনে অন্য কারও যোগাযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের সিদ্ধান্ত এবং যাত্রীদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
