সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে যখন চারপাশ ধীরে ধীরে নীরব হয়ে আসে, তখন সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে অন্যরকম এক দৃশ্য চোখে পড়ে। মাগরিবের নামাজ শেষ হওয়ার পর মসজিদের এক কোণে বসে একসঙ্গে কোরআন পড়তে শুরু করেন একদল প্রবীণ মানুষ। কারও বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এসেছে, কারও হাত কাঁপে, আবার কারও চুল পুরোপুরি সাদা হয়ে গেছে। অথচ কোরআনের অক্ষর শেখার আগ্রহে তাদের চোখেমুখে যেন নতুন প্রাণের ছাপ।
শৈশবে অভাব-অনটন, সংসারের দায়িত্ব কিংবা জীবিকার তাগিদে অনেকেরই কোরআন শেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। জীবনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সেই অপূর্ণতাই যেন তাদের আবার মসজিদের মেঝেতে ফিরিয়ে এনেছে। এখন নিয়মিত সময় বের করে তারা শিখছেন পবিত্র কোরআন পড়ার পদ্ধতি। পাশাপাশি শুদ্ধভাবে নামাজ আদায়ের প্রয়োজনীয় নিয়মকানুনও আয়ত্ত করছেন।
কামারখন্দ উপজেলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাতে এমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজনের সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয়রা। ‘শেখ আব্দুস সালাম ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে বিনা খরচে পরিচালিত কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমের দ্বিতীয় ব্যাচের ৪২ জন প্রবীণ শিক্ষার্থীর হাতে এদিন কোরআন শরিফ তুলে দেওয়া হয়।
এই শিক্ষার্থীদের অনেকেই দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা সবজি বিক্রির মতো পেশার সঙ্গে যুক্ত। দিনের বড় একটি সময় কাজের পেছনে ব্যয় করার পরও তারা নিয়মিত সন্ধ্যার ক্লাসে উপস্থিত হয়েছেন। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে উপজেলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম আব্দুল মোমেন তাদের মাদানি পদ্ধতিতে কোরআন পড়িয়েছেন।
কর্মজীবনের ব্যস্ততা কিংবা শারীরিক ক্লান্তি—কোনোটিই তাদের এই শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে পারেনি। মাগরিবের নামাজের পর শুরু হওয়া পাঠ চলে এশার আজান পর্যন্ত। প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমের পরও প্রবীণ শিক্ষার্থীরা মসজিদে এসে মনোযোগ দিয়ে পাঠ নিয়েছেন।
এই আয়োজনের দিন শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল আরও একটি বিশেষ চমক। লটারির মাধ্যমে ৭০ বছর বয়সী শফিকুল ইসলাম তারাকে বিনা খরচে ওমরাহ পালনের সুযোগ দেওয়া হয়। ‘স্যাম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস’ নামের একটি ভ্রমণ প্রতিষ্ঠান তাকে এই সুযোগ করে দেয়। অপ্রত্যাশিত এই উপহারের খবর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শফিকুল ইসলাম।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি ছিল কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমের দ্বিতীয় ব্যাচ। বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক মাওলানা ক্বারী মুয়াজ নোমানীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যাচের পাঠদান শুরু হয়।
বর্তমান ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ হতে এখনও প্রায় তিন মাস সময় বাকি রয়েছে। এরপরই তৃতীয় ব্যাচের কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় বয়স্ক মানুষদের ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে বিনামূল্যের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোরআন বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা ও হাদিসের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কামারখন্দ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লা আল মামুন, শেখ আব্দুস সালাম ফাউন্ডেশনের বয়স্ক কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমের পরিচালক মাওলানা ক্বারী মো. মুয়াজ মোহা, বেলকুচি ওলামা ঐক্য পরিষদের সেক্রেটারি হাফেজ মো. রফিকুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
এই প্রবীণ শিক্ষার্থীদের গল্পের সবচেয়ে বড় দিক হলো—শেখার জন্য বয়স যে শেষ সীমা নয়, সেটিই তারা নিজেদের জীবন দিয়ে দেখাচ্ছেন। ছোটবেলায় যে সুযোগটি পাননি, জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও সেটি অর্জনের চেষ্টা করছেন তারা।
কেউ দিনের পর দিন শ্রম দিয়ে সংসার চালিয়েছেন, কেউ ছোট ব্যবসা করেছেন, কেউ রাস্তায় সবজি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। সেই কর্মজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখন সন্ধ্যার কয়েকটি ঘণ্টা তারা ব্যয় করছেন কোরআনের অক্ষর শেখার পেছনে।
তাদের এই আগ্রহ শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ নয়; বরং জীবনের যে কোনো পর্যায়ে নতুন কিছু শেখার সুযোগ ও ইচ্ছা থাকলে বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না—এমন একটি বার্তাও তুলে ধরছে কামারখন্দের এই উদ্যোগ।
