বিদ্যুতের নতুন тариф কার্যকর হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের মধ্যে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রিপেইড ও পোস্টপেইড—দুই ধরনের মিটার ব্যবহারকারীদের অনেকেই আগের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা জানাচ্ছেন। বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল বিলের পাশাপাশি মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ায় প্রকৃত বিল কত হচ্ছে, তা নিয়েও অনেকের প্রশ্ন রয়েছে।
বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণে একাধিক স্ল্যাব চালু রয়েছে। একজন গ্রাহক মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, তার ওপর নির্ভর করে ইউনিটপ্রতি মূল্য নির্ধারিত হয়। নির্ধারিত হারের সঙ্গে আবার ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়।
বিদ্যুৎ বিলের কাগজে সাধারণত ব্যবহৃত ইউনিটের পরিমাণের পাশাপাশি গ্রাহকের অনুমোদিত লোড অনুযায়ী ডিমান্ড চার্জও দেখানো হয়। বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা। গ্রাহক নিজস্ব মিটার না কিনে বিতরণ সংস্থার মিটার ব্যবহার করলে এর সঙ্গে মিটার ভাড়াও যুক্ত হতে পারে।
এর বাইরে আগের মাসের কোনো বকেয়া থাকলে সেটিও পরবর্তী বিলে যোগ হয়। নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ না করলে প্রযোজ্য বিলম্ব মাশুলও দিতে হয়। ফলে একটি বিদ্যুৎ বিলে মূল এনার্জি চার্জের পাশাপাশি ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট, মিটার ভাড়া ও প্রয়োজনে বিলম্ব মাশুল যুক্ত হতে পারে।
ডিমান্ড চার্জ কী এবং কেন নেওয়া হয়?
বিদ্যুৎ খাতে ডিমান্ড চার্জ বলতে মূলত গ্রাহকের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বজায় রাখার খরচ বোঝানো হয়। বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য ট্রান্সফরমার, লাইন, সংযোগ ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রস্তুত রাখার সঙ্গে এই চার্জের সম্পর্ক রয়েছে।
বর্তমান হিসাবে আবাসিক গ্রাহকের প্রতি কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের বিপরীতে মাসে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়।
অর্থাৎ কোনো বাসাবাড়ির অনুমোদিত লোড যদি ২ কিলোওয়াট হয়, তাহলে মাসে ডিমান্ড চার্জ হবে ৮৪ টাকা। আবার অনুমোদিত লোড ১০ কিলোওয়াট হলে শুধু ডিমান্ড চার্জ বাবদ দিতে হবে ৪২০ টাকা।
এখানেই অনেক গ্রাহকের আপত্তি। কারণ বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লোড অনুমোদন করানো হলে পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ কম ব্যবহার করলেও সেই বাড়তি লোডের ভিত্তিতে ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়।
থ্রি-ফেজ সংযোগের ক্ষেত্রে মিটার ভাড়াও তুলনামূলক বেশি। ফলে অনুমোদিত লোড এবং মিটার ভাড়ার কারণে মূল বিদ্যুৎ ব্যবহারের বাইরেও একটি উল্লেখযোগ্য অর্থ মাসিক বিলে যুক্ত হতে পারে।
মিটার ভাড়ার হিসাব কীভাবে হয়?
বিদ্যুৎ বিল আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়ানো, বকেয়া কমানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সহজ করতে দেশে ধীরে ধীরে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
বিতরণ সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, একটি সিঙ্গেল-ফেজ প্রিপেইড মিটারের মূল্য প্রায় ৬ হাজার টাকা। মিটারের সম্ভাব্য ১০ বছরের ব্যবহারকাল ধরে ১২০ মাসে সেই অর্থ সমন্বয় করার ভিত্তিতে মাসে ৪০ টাকা করে ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যদিকে থ্রি-ফেজ মিটারের মূল্য প্রায় ২৫ হাজার টাকা ধরা হলে এর মাসিক ভাড়া ২৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে বিতরণ সংস্থার পক্ষ থেকে নতুন মিটার সরবরাহ করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
প্রিপেইড মিটারে টাকা কাটে কীভাবে?
প্রিপেইড মিটারে গ্রাহক টাকা রিচার্জ করার পর সেই অর্থ থেকে নির্ধারিত কিছু চার্জ আগে সমন্বয় করা হয়। এর মধ্যে মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং প্রযোজ্য ভ্যাট থাকতে পারে। এরপর অবশিষ্ট অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা থাকে।
এ কারণে অনেক গ্রাহকের মনে হয়, বিদ্যুৎ ব্যবহার করার আগেই কেন টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকলেও নির্ধারিত চার্জ কেটে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য, প্রিপেইড ও পোস্টপেইড—দুই ব্যবস্থাতেই মূল ট্যারিফ ও নির্ধারিত চার্জের কাঠামো একই। পার্থক্য হলো, প্রিপেইড ব্যবস্থায় চার্জগুলো রিচার্জের সময় আগেই সমন্বয় হয়ে যায়।
প্রিপেইড মিটার নিয়ে আপত্তি কেন?
দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটার স্থাপন নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে আপত্তি ও আন্দোলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। গ্রাহকদের একটি অংশের অভিযোগ, আগে টাকা পরিশোধ করে পরে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পদ্ধতিতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জসহ কিছু এলাকায় এ নিয়ে সভা, সমাবেশ ও গণ-অনশনের মতো কর্মসূচিও হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সংগঠনগুলো গ্রাহকদের উদ্বেগ তুলে ধরছে।
প্রিপেইড মিটারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য, নতুন ব্যবস্থায় যাওয়ার আগে গ্রাহকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ও গণশুনানি করা প্রয়োজন ছিল। তাঁদের মতে, বিভিন্ন চার্জ কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে এবং কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে—তা আরও পরিষ্কারভাবে জানানো দরকার।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের প্রশ্ন
ভোক্তা অধিকারকর্মীদের একটি অংশ ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, গ্রাহকের কাছ থেকে আলাদাভাবে এসব অর্থ নেওয়া হলে এর বিপরীতে বিতরণ সংস্থার প্রকৃত ব্যয় ও হিসাব স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
তাঁরা আরও মনে করেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা এবং বাস্তবে গ্রাহককে দেওয়া সেবার মধ্যে পার্থক্য থাকলে ডিমান্ড চার্জের কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে।
মিটারকে আধুনিক প্রযুক্তি হিসেবে গ্রাহকের সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যম করার বদলে সেটি যদি অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হিসেবে মানুষের কাছে প্রতীয়মান হয়, তাহলে ব্যবস্থাটির প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন ভোক্তা প্রতিনিধিরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আস্থার সংকটই বড় বিষয়
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমান্ড চার্জের মূল ধারণা হলো গ্রাহকের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বজায় রাখা। কিন্তু কোনো গ্রাহক যদি নিয়মিতভাবে অনুমোদিত লোড অনুযায়ী সরবরাহ না পান, তখন কেন তাঁকে সেই লোডের ভিত্তিতে চার্জ দিতে হবে—এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্রাহকদের অভিযোগ ও চার্জ নির্ধারণের বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হলে আস্থা বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আয়-ব্যয়ের হিসাব আরও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা এবং গ্রাহকদের কাছে চার্জের কারণ ব্যাখ্যা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিতরণ সংস্থার বক্তব্য কী?
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো অবশ্য প্রিপেইড মিটারে অতিরিক্ত কোনো চার্জ নেওয়ার অভিযোগ নাকচ করেছে। তাদের বক্তব্য, পোস্টপেইডের মতো প্রিপেইড মিটারেও নির্ধারিত ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ প্রযোজ্য। পার্থক্য হলো, প্রিপেইড ব্যবস্থায় এসব অর্থ রিচার্জের সময়ই সমন্বয় করা হয়।
ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড ব্যবস্থায় বিলিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ে এবং গ্রাহক তার ব্যবহারের হিসাব সহজে জানতে পারেন। মিটার এককালীন কিনে না নিলে নির্ধারিত নিয়মে ভাড়া নেওয়া হয়।
প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলের ওপর নির্দিষ্ট হারে রিবেট বা ছাড়ও পান বলে জানিয়েছে বিতরণ সংস্থা।
ডিমান্ড চার্জ নিয়ে বিইআরসির অবস্থান
বিদ্যুতের বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ভূমিকা রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করেই ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম পরিবর্তনের সময়ও ডিমান্ড চার্জ বাড়ানো হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
প্রিপেইড মিটার নিয়েও সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি পর্যালোচনা করেছে এবং বড় ধরনের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি বলে বিইআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে মিটার ভাড়া রাখার বিষয়টি মূলত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে বিদ্যুতের মূল ব্যবহারের খরচের পাশাপাশি ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও ভ্যাট—এই অতিরিক্ত অংশগুলো কীভাবে নির্ধারিত হয়, তা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে আগ্রহ ও প্রশ্ন দুটিই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব চার্জের হিসাব আরও সহজভাবে প্রকাশ এবং গ্রাহকদের কাছে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া গেলে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
