বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়া, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
সোমবার সকালের লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০৭ ডলার ৮২ সেন্টে পৌঁছেছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৩ শতাংশেরও বেশি বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও বেড়ে ১০৩ ডলার ২২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং তেল পরিবহন ব্যবস্থার ওপর সাম্প্রতিক হামলার কারণে বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে পাইপলাইনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি অংশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ইয়ানবু বন্দরে থাকা মজুত দিয়ে সীমিত সময়ের জন্য রপ্তানি কার্যক্রম চালানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার একটি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনায় নাবিকদের সরিয়ে নিতে হয়েছে। একই সময়ে ইরানও তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে হতাহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব ঘিরেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক তৎপরতা ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি পরিবহন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরবরাহ সংকটের শঙ্কায় গত এক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
এ পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার আশঙ্কা থাকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় কয়েক কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আমদানি খরচ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু তেল খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে একদিকে বাড়তি আমদানি ব্যয় সামলাতে হবে, অন্যদিকে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণেও বাড়তি উদ্যোগ নিতে হতে পারে।
