মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দাবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নাকি মাত্র ১৪ দিনের তেল মজুত রয়েছে। তবে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দাবি বাস্তবতার পুরো চিত্র তুলে ধরে না।
মূলত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর)-এ সংরক্ষিত তেলের পরিমাণকে দেশের দৈনিক তেল ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করেই এই হিসাব প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু এসপিআরকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক নয়, কারণ এটি জরুরি পরিস্থিতির জন্য সংরক্ষিত বিশেষ মজুত।
‘১৪ দিনের তেল’ ধারণার উৎস
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত কমে প্রায় ২৮৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। এ পরিমাণকে দেশটির দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের সঙ্গে ভাগ করলে প্রায় দুই সপ্তাহের সমপরিমাণ ফল পাওয়া যায়। সেখান থেকেই ‘১৪ দিনের তেল’ দাবির জন্ম।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হিসাব বিভ্রান্তিকর। কারণ এসপিআরের উদ্দেশ্য দেশের পুরো জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা নয়; বরং বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া।
এসপিআরের ভূমিকা কী?
স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ হলো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিয়ন্ত্রিত জরুরি তেলভান্ডার। ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের অভিজ্ঞতার পর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
টেক্সাস ও লুইজিয়ানার ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারে রাখা এই মজুত থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ প্রায় ৪৪ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া সম্ভব। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেই তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে এটি নিয়মিত চাহিদা পূরণের উৎস নয়, বরং সংকটকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
উদ্বেগের কারণ কোথায়?
‘মাত্র ১৪ দিনের তেল’ কথাটি অতিরঞ্জিত হলেও জ্বালানি বাজারে উদ্বেগের বাস্তব কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন চাপের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এছাড়া সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন অবকাঠামোতে হামলার ঘটনাও বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
কেন কমেছে কৌশলগত মজুত?
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার এসপিআর থেকে বড় পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যেমন মজুত থেকে তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, তেমনি সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও অতিরিক্ত তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৌশলগত মজুত আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
শুধুই এসপিআরের ওপর নির্ভরশীল নয় যুক্তরাষ্ট্র
ভাইরাল দাবির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেল উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক মজুতকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক এবং বেসরকারি খাতের কাছেও বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি মজুত থাকে।
তাই এসপিআরের পরিমাণ কমে যাওয়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল সরবরাহ দ্রুত ফুরিয়ে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
সারসংক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাত্র ১৪ দিনের তেল রয়েছে—এ দাবি বাস্তবতার সরলীকৃত ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা। সংখ্যাটি কেবল কৌশলগত তেল মজুতের সঙ্গে দৈনিক ব্যবহারের তুলনা থেকে এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন, বাণিজ্যিক মজুত এবং অন্যান্য সরবরাহ উৎস বিবেচনায় নিলে পরিস্থিতি অনেক ভিন্ন।
তবে এটাও সত্য যে কৌশলগত মজুত আগের তুলনায় কমে এসেছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহপথগুলো বর্তমানে নানা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক বাজারে চাপ বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
