চীনের হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তিতে নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। দৌড়ের মাঠে মানুষের গতি ছাড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেখানোর পর এবার এসব রোবটকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করা হচ্ছে। প্যাকেজিং, গুদাম পরিচালনা কিংবা সূক্ষ্ম যান্ত্রিক কাজের মতো কাজে তারা মানুষের বিকল্প হিসেবে কতটা কার্যকর হতে পারে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস’। মানুষের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আদলে আয়োজিত বিভিন্ন ইভেন্টের পাশাপাশি এখানে রোবটকে বাস্তব জীবনের নানা পরিস্থিতির অনুকরণে তৈরি পরিবেশে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে। কারখানা, রেস্তোরাঁ, অফিস এমনকি জরুরি পরিস্থিতির মতো পরিবেশেও তাদের সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে।
এবারের আয়োজনে মোট ৫১টি ইভেন্ট রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি ক্রীড়াভিত্তিক এবং ২১টি বাস্তব কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিযোগিতার উল্লেখযোগ্য একটি অংশে রোবটকে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
ক্রীড়া ইভেন্টে ইতোমধ্যে নজর কেড়েছে রোবটের দৌড়। ১০০ মিটার দৌড়ে দুটি হিউম্যানয়েড রোবট এমন সময় করেছে, যা উসাইন বোল্টের ৯.৫৮ সেকেন্ডের বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও কম। আগের বছরের তুলনায় এটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বড় উন্নতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে শুধু দ্রুত দৌড়াতে পারলেই যে রোবটের সক্ষমতা প্রমাণ হয় না, সেটিও প্রতিযোগিতার মাঠে স্পষ্ট হয়েছে। কয়েকটি রোবট দৌড় শেষ করার পর নির্ধারিত জায়গায় দ্রুত থামতে পারেনি। ফলে ফিনিশিং লাইনের পর রাখা নিরাপত্তা ম্যাটে গিয়ে ধাক্কা খাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
৪০০ মিটার দৌড়েও একটি হিউম্যানয়েড রোবট উল্লেখযোগ্য সময় করেছে। তার দৌড়ের গতি মানুষের বিশ্বমানের পারফরম্যান্সের সঙ্গে তুলনা করার মতো হলেও রোবটের বাস্তব দক্ষতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গতি একমাত্র মানদণ্ড নয়।
এবারের প্রতিযোগিতায় দড়ি টানাটানি, ভারোত্তোলনসহ বিভিন্ন শক্তিনির্ভর ইভেন্টও রয়েছে। পাশাপাশি চীনের ঐতিহ্যবাহী তাই চি এবং পিচ-পটের মতো খেলাতেও অংশ নিচ্ছে রোবট। প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের এই সমন্বয় দর্শকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে।
রোবটিকস খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, আগের বছরের তুলনায় এবারের প্রতিযোগিতা অনেক বেশি কঠিন। দীর্ঘ সময় কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যাটারির সক্ষমতা, যন্ত্রের তাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শারীরিক ভারসাম্য—সবকিছুর ওপরই বাড়তি চাপ পড়ছে। শিল্প খাতে রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও এসব পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হচ্ছে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের ছোট ছোট জটিলতা মোকাবিলা করা। যেমন—কোনো কেবল সামান্য ভিন্ন কোণে থাকলে সেটি সঠিকভাবে সংযোগ করা, নির্ধারিত জায়গা থেকে কোনো প্যাকেট সরে গেলে সেটি শনাক্ত করা কিংবা কোনো বস্তু হাতের নাগালের বাইরে চলে গেলে নতুন অবস্থান অনুযায়ী কাজের কৌশল পরিবর্তন করা।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোবটকে শুধু বস্তু শনাক্ত করলেই হবে না। তাকে নিজের হাত, শরীর ও পায়ের অবস্থানও সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে কতটা শক্তি প্রয়োগ করা প্রয়োজন, সেটিও বুঝতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, মানুষের নির্দেশনা ছাড়াই ভুল হলে পরিস্থিতি সামলে নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারছে কি না।
তাই দৌড়ের মাঠে মানুষের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বড় উদাহরণ। কিন্তু ভবিষ্যতের কারখানা, গুদাম কিংবা অফিসে সত্যিকারের সহকর্মী হিসেবে জায়গা করে নিতে হলে রোবটকে আরও কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
কারণ মানুষের মতো দ্রুত দৌড়ানো এক ধরনের সক্ষমতা, আর মানুষের মতো অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল পরিবেশে নির্ভুলভাবে কাজ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত এই দ্বিতীয় পরীক্ষাই নির্ধারণ করবে হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কতটা সফল হতে পারে।
