সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল নিয়ে বড় ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
তবে পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। তাই সব বিষয় পর্যালোচনা করে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
সোমবার, ১৭ আগস্ট সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পে কমিশন সংক্রান্ত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে পে-স্কেলের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, পে কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে একাধিক বিষয় জড়িত। বেতন কাঠামো নির্ধারণের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আজ আলোচনা হয়েছে, তবে আরও আলোচনা প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে আবারও বৈঠক হবে।
তবে নতুন পে-স্কেল কবে বাস্তবায়িত হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, চলতি বছরের মধ্যেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সরকার কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে।
অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হলেও এর চূড়ান্ত রূপ জানতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে একই সময়ে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার কাজ করেছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী আরও দৃশ্যমান উন্নতি আনতে সময় প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন উদ্যোগও প্রশংসা পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, গত ১৮০ দিনে সরকার যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে এবং যেসব উদ্যোগ শুরু করেছে, সেগুলো জনগণের কাছে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হবে বলে তিনি আশা করছেন।
সরকারের নেতৃত্বে কয়েকটি সংকটময় পরিস্থিতিও মোকাবিলা করা হয়েছে বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এরপর আলোচনায় আসে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের সংকট যেন তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ আনার পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষেত্রে মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ডবেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
একই সঙ্গে মহেশখালী এলাকায় আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্য জায়গা নির্ধারণের জন্য জরিপ চলছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি ভিত্তিতে দুটি এফএসআরইউ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমানে দেশে সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ রয়েছে। তবে এসব অবকাঠামোতে যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো কারণে সমস্যা দেখা দিলে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ কারণেই ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গ্যাসের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা কমানোর বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে দেশের গ্যাস সরবরাহে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছিল। এখন সেই নির্ভরতা কমাতে দেশের ভেতরে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সরকার আশা করছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান বাড়ানো সম্ভব হবে। এর ফলে আমদানির ওপর চাপও কিছুটা কমানো যেতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া বেশিরভাগ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তিনি এখনো ওই প্রতিবেদনটি নিজে পড়েননি। সেখানে কিছু পর্যবেক্ষণ থাকতে পারে বলে শুনেছেন। কিন্তু পুরো প্রতিবেদন না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো প্রতিবেদনে যদি অনুমাননির্ভর তথ্য থাকে, শুধু সেই অনুমানের ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিতে পারে না।
ফলে প্রতিবেদনটি হাতে নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করার পরই এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে, একই দিনে অর্থনীতি, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি নিরাপত্তা, গ্যাস অনুসন্ধান এবং সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম—বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের অবস্থান সামনে এসেছে।
এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—চলতি বছরের মধ্যেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
তবে নতুন বেতন কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন আসবে, কোন গ্রেডে কত বেতন নির্ধারিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
