থাইল্যান্ডের বিভিন্ন খাতে চলমান শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে থাইল্যান্ডের একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠকে বিষয়টি উঠে আসে। মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সৌজন্য সাক্ষাতে দুই দেশের শ্রমবাজার, কর্মী নিয়োগ এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা, কর্মীদের জন্য ব্যয় কমানো, ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ভিসা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৪ বছর পূর্তিও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও নৈতিক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মী নিয়োগের প্রাথমিক ব্যয় যেন নিয়োগকর্তা বহন করেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি কর্মীদের স্থানীয় ভাষায় স্পষ্ট ও মানসম্মত চাকরির চুক্তি, উপযুক্ত বেতন, থাকার ব্যবস্থা, চিকিৎসা ও বিমাসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, থাইল্যান্ডে বিভিন্ন খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে রয়েছে বড় একটি দক্ষ ও সম্ভাবনাময় শ্রমশক্তি। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে থাইল্যান্ডে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বলেন, থাইল্যান্ডে শুধু নির্মাণ বা অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে নয়, দক্ষ পেশাজীবীদের জন্যও বাংলাদেশের কর্মীরা উপযুক্ত হতে পারেন। দেশ দুটির সাংস্কৃতিক ও আবহাওয়াগত কিছু মিল থাকায় থাইল্যান্ড বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার হয়ে উঠতে পারে।
তবে তিনি বলেন, এই শ্রমবাজারকে কার্যকর করতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে দুই দেশকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
থাইল্যান্ডের শ্রম বিষয়ক সিনেট স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান নিতরুত্তি সুথিনন জানান, কর্মী নিয়োগের জন্য থাইল্যান্ড বর্তমানে চারটি দেশের সঙ্গে চুক্তির আওতায় কাজ করছে। তবে কম্বোডিয়ার সঙ্গে সাম্প্রতিক সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে দেশটির কিছু খাতে কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। এতে থাইল্যান্ডের নির্মাণ, কৃষি ও হালাল খাদ্য উৎপাদন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে থাইল্যান্ড। অর্থাৎ বাংলাদেশ হতে পারে দেশটির কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পঞ্চম অংশীদার দেশ।
তবে বাংলাদেশ থেকে কর্মী যাওয়ার পর ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও অবস্থান করা, থাইল্যান্ডকে অন্য দেশে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার এবং মানবপাচারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন থাই প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এসব উদ্বেগ সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে শিগগিরই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পথ তৈরি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বৈঠকে থাইল্যান্ডের শ্রম বিষয়ক সিনেট স্ট্যান্ডিং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান চিনাচট সেনস্যাঙ্ক, শ্রম বিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ড. পিরাসিথ কুনলার্তারিপনসহ প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন।
