আজ (২৯ জুলাই) বিশ্ব বাঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ ও বন কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষা করা মানে শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে সংরক্ষণ নয়; বরং পুরো ম্যানগ্রোভ বন, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা।
বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বেড়ে ১২৫-এ পৌঁছেছে। আগের শুমারিগুলোর তুলনায় এই বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ফলে বাঘ শিকার ও মানুষ-বাঘ সংঘাত আগের তুলনায় কমেছে। তবে চোরা শিকার, বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো হুমকি এখনো উদ্বেগের কারণ।
বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণের উদ্যোগ কয়েক দশক আগে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে আইন আরও কঠোর করা হয়। এর ফলে বাঘ শিকার, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই দশকে বিভিন্ন কারণে পূর্ব সুন্দরবনে বহু বাঘের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক বনজীবীও। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে বন বিভাগ জানিয়েছে। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে বাঘ হত্যার বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
চলতি বছরের শুরুতে শিকারিদের ফাঁদে আটকে পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীকে উদ্ধার করে দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘটির চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরাও স্থাপন করা হয়েছে।
বিশ্ব বাঘ দিবসের আগে সুন্দরবনের দুটি ভিন্ন এলাকায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা পাওয়ার ঘটনাও আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন বন কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, নদী সাঁতরে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়া বাঘের স্বাভাবিক আচরণের অংশ হলেও এমন দৃশ্য কাছ থেকে খুব কমই দেখা যায়।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বনাঞ্চলে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় মানুষের উপস্থিতি কমেছে। এতে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী তুলনামূলক স্বাভাবিক পরিবেশে বিচরণ করতে পারছে এবং বন অপরাধও হ্রাস পেয়েছে।
পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু বাঘ নয়, তার খাদ্যশৃঙ্খল, আবাসস্থল এবং পুরো বনজ পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি চোরা শিকার দমন, বন ধ্বংস রোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
