তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্র) নদীর ওপর নির্মাণাধীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চীনের একদল ভূতাত্ত্বিকের গবেষণায় বলা হয়েছে, বাঁধের সম্ভাব্য জলাধারের নিচে একটি সক্রিয় ভূ-ফাটল (ফল্ট লাইন) রয়েছে, যা ভবিষ্যতে ভূমিকম্প বা ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এই পরিস্থিতি শুধু প্রকল্পের জন্যই নয়, ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে–এর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ব হিমালয়ের পাইজেন ফল্ট বহু হাজার বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই ফল্টের অবস্থান জলাধার এলাকার খুব কাছাকাছি হওয়ায় বড় ধরনের ভূমিকম্প বা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন বাঁধসহ আশপাশের সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি ভূ-তাত্ত্বিক সক্রিয়তার কারণে এলাকাটির শিলা ও মাটির স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়েছে। ফলে বড় প্রকৌশল স্থাপনার ভিত্তি অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জলাধারের পানির চাপ এবং সম্ভাব্য ভূমিকম্পের প্রভাবে পাহাড়ি ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাল শক্তিশালী করা, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ এবং ভূমিধস প্রতিরোধে উন্নত প্রকৌশল ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।
চীন গত বছর এই বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ শুরু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম থ্রি গর্জেস বাঁধের উৎপাদন সক্ষমতারও কয়েক গুণ বেশি।
ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বত থেকে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসামে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত হয়। পরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এটি যমুনা নামে প্রবাহিত হয়। ফলে নদীর উজানে এত বড় বাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও বাংলাদেশে পানি প্রবাহ, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং পানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, পাইজেন অঞ্চলটি হিমালয়ের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এখানে নিয়মিত ভূমিকম্প হয়। অতীতের ভূতাত্ত্বিক তথ্য এবং ২০১৭ সালের শক্তিশালী ভূমিকম্পের উদাহরণ তুলে ধরে তারা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতেও এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাদের মতে, সম্ভাব্য ভূমিকম্প বা ভূমিধসের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে নির্মাণ ও পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে বাঁধ এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকে।
