
দেশের অসংখ্য কর্মজীবী নারীর দৈনন্দিন জীবনে এক অদৃশ্য চাপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে—যার নাম ‘অদৃশ্য কর্মঘণ্টা’। ঘরের কাজ ও পেশাগত দায়িত্ব মিলিয়ে অনেক নারী প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করলেও এর বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়।
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ২৯ বছর বয়সী এক নারী শ্রমিকের জীবনচিত্রই এর বাস্তব উদাহরণ। ভোরে উঠে পরিবারের জন্য রান্না ও গৃহস্থালির কাজ শেষ করে তিনি কর্মস্থলে যান। দিনভর কারখানায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আবারও রান্না ও সংসারের দায়িত্ব সামলাতে হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন তার কর্মঘণ্টা দাঁড়ায় প্রায় ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা।
অদৃশ্য শ্রমের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘর ও কর্মক্ষেত্রে দ্বৈত দায়িত্ব পালনের কারণে নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত কাজকে অনেক সময় পরিবার, সমাজ এমনকি নারীরাও যথাযথ গুরুত্ব দেন না।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী দৈনিক কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা নির্ধারিত হলেও, গৃহস্থালির কাজের কোনো স্বীকৃতি না থাকায় নারীদের প্রকৃত শ্রমঘণ্টা হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
Bangladesh Institute of Development Studies-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি গৃহস্থালির কাজ করেন।
এছাড়া Bangladesh Bureau of Statistics-এর তথ্য অনুযায়ী, নারীরা পুরুষদের তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি মজুরিবিহীন কাজ করেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি এই অদৃশ্য শ্রমকে জাতীয় আয় হিসাবের আওতায় আনা হয়, তাহলে দেশের মোট জিডিপিতে নারীদের অবদান প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত কাজের চাপ নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা এবং পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি মানসিক চাপ, ক্লান্তি, অবসাদ ও হতাশার মতো সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গত দুই দশকে নারীদের মধ্যে হৃদরোগজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একইভাবে কিডনি রোগেও নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার পুরুষদের তুলনায় বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক Kamal Chowdhury বলেন, ঘর ও কর্মস্থলের দ্বৈত চাপ নারীদের শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকেই ক্ষতির কারণ হচ্ছে। তার মতে, এই অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং কাজের পাশাপাশি বিশ্রাম ও বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে Fauzia Moslem মনে করেন, নারীদের গড়ে দৈনিক ১৪-১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যনীতিতে শুধু প্রজনন নয়, নারীর সার্বিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
করণীয় কী?
বিশ্লেষকদের মতে—
- গৃহস্থালির কাজকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে
- পরিবারে কাজের সমান বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে
- কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে
- মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করতে হবে