সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতারের পর এক-এগারোর অন্য কুশীলবদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কুশীলবদের মধ্যে বিদেশে অবস্থানকারীরা যেমন সতর্ক অবস্থানে চলে গেছেন, পাশাপাশি দেশে অবস্থানকারীরা চলে গেছেন আত্মগোপনে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাবেক ওই দুই শীর্ষ কর্মকর্তার গ্রেফতারের পর কেউ কেউ দেশ ছাড়ারও চেষ্টা করছেন। তবে তাদের বিদেশ যাত্রার ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ওই কুশীলবরা কেউ বিমানবন্দর অতিক্রম করতে গেলে বাধার মুখে পড়বেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে তথ্য মিলছে।
সূত্র বলছে, দুই শীর্ষ কর্মকর্তা ছাড়াও এক-এগারোর সময় প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় কেউ কেউ নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত অনেকেই রয়েছেন পর্দার আড়ালে। তবে বিতর্কিত ওই কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের তালিকা তৈরি করছে। বিশেষ করে বিতর্কিতদের মধ্যে এখনো যারা দেশে আছেন তারা যাতে দেশ ত্যাগ না করতে পারেন সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অভিবাসন পুলিশের সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।
এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, আদালতের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্দেশ এলে কারও বিদেশ যাত্রায় বাধা দেওয়া হয়। তবে এর বাইরেও বিশেষ ব্যবস্থায় বিদেশ যাত্রায় বাধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে প্রায় উনিশ বছর আগে গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত করে সেনাবাহিনীর একটি অংশের সমর্থনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল। বিতর্কিত ওই সরকার এক-এগারোর সরকার নামে বহুল পরিচিত। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর মধ্যে হঠাৎ ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা কয়েকজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের বেসামরিক সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে ওই সময় দেশ পরিচালিত হয়েছে। দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এক-এগারোর সরকার শুরু থেকেই রাজনীতিবিদদের চরিত্রহননের মিশনে নেমেছিল। শুদ্ধি অভিযানের নামে দেশজুড়ে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হয়। সে সময় একদল সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে ও পর্দার আড়ালে থেকে সব কলকাঠি নেড়েছিলেন। কথিত দুর্নীতি প্রতিরোধের নামে তখন অনেকে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্ত
ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক বিভাজনের চেষ্টা করেছিল এক-এগারোর সরকার। ওই সরকারের নেপথ্যে ভূমিকা পালনকারী কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনীতিবিদদের অপদস্ত করে তাদের সম্পর্কে দেশবাসীর কাছে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা। এর মধ্য দিয়ে এক-এগারোর সরকারকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রাখার অপচেষ্টা ছিল তাদের। কিন্তু দেশের জনগণ অগণতান্ত্রিক ওই সরকারকে বেশি দিন মেনে নেয়নি। ফলে তাদের সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায়। এক-এগারোর ওই সরকার শেষ মুহূর্তে এসে আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক সমঝোতায় পৌঁছে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়ে নিরাপদ প্রস্থান নেয়। ফলে পরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিতর্কিত ওই সরকারের কুশীলবদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়। বিতর্কিত ওইসব সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের কেউ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন, আবার কেউ দেশ ছেড়ে প্রবাসে স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করছেন। আওয়ামী লীগ প্রায় ষোল বছর টানা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও ওইসব বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং সব অপকর্মের দায়মুক্তি দিয়ে গেছে তৎকালীন সরকার।
দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও এক-এগারোর কুশীলবদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার দেড় মাসের মাথায় এক-এগারোর কুশীলব হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ মানব পাচার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যার পৃথক দুটি মামলায় তাদের গ্রেফতার করে। সাবেক প্রভাবশালী এই দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে। এরপর থেকেই আতঙ্কে আছেন এক-এগারোর কুশীলবরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা পাওয়া গেলে আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হবে। তবে ঢালাওভাবে কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। তিনি জানান, সে সময়ে ব্যবসায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় এবং তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বিষয় নিশ্চিত হলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হবে। এছাড়া প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জোর করে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ওই সময় যারা বাড়াবাড়ি করেছেন তাদের ছাড় না দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বাধা নেই ফৌজদারি অপরাধের বিচার কার্যক্রমে
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকার এক-এগারোর কুশীলবদের দায়মুক্তি দিলেও তাদের ফৌজদারি অপরাধের বিচারে বাধা নেই বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এক-এগারোর সরকার সেনা-সমর্থিত ছিল, সংবিধানে এমন সরকারের কোনো স্বীকৃতি নেই। তবে ওই সরকারের কার্যক্রম পরে সংসদে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় কেউ যদি আইন ভঙ্গ করে নির্যাতন করে, তাহলে সেই নির্যাতনের অভিযোগ আনা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, গ্রেফতার, তদন্ত ও হেফাজতে নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু নির্যাতন করা যাবে না। নির্যাতনের ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিযোগ আনা সম্ভব।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক-এগারোর সময় যারা নির্যাতন ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা করে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য একটি কমিশনও গঠন করা যেতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের নীতির ওপর।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, এক-এগারোর সময় অবৈধ গ্রেফতার, নির্যাতন, দুর্নীতি ও জিম্মি করে অর্থ আদায়সহ নানা গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে এবং বিনা বিচারে আটক রেখে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে। তিনি বলেন, ফৌজদারি অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। অভিযোগ এলে তা তদন্ত ও বিচার হতে পারে। সরকার চাইলে ওই সময়ের ঘটনাগুলো নিরূপণে একটি কমিশন গঠন করতে পারে এবং ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ আহ্বান করতে পারে।
মূল পরিকল্পনাকারীদের পরিচয়
দুই হাজার সাত সালের এগারো জানুয়ারি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে এক-এগারোর সরকার গঠিত হয়। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ, তবে ক্ষমতার মূল কেন্দ্র ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। পরবর্তী সময়ে অনেকেই বিদেশে চলে যান। ফখরুদ্দীন আহমদ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। মইন ইউ আহমেদও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তৎকালীন আরও কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা বিদেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। সূত্র বলছে, তাদের কেউ কেউ গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন এবং প্রয়োজন হলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
