বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নিজ বাড়ি ও ভাড়া বাসা জুড়ে নেমে এসেছে শোকের আবহ। নিরাপত্তাকর্মীসহ সেখানে উপস্থিত সবাই যেন বেদনার কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন। এদিকে বড় ছেলে তারেক রহমান মায়ের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনায় নামাজ আদায় করছেন, দোয়া-দরুদ ও কুরআন তেলাওয়াত করছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খালেদা জিয়ার ভাড়া বাসা ‘ফিরোজা’তে এখনো নিরাপত্তাকর্মীদের কড়া পাহারা অব্যাহত রয়েছে।
প্রহরী ছাউনি রয়েছে ঠিক আগের মতোই। অন্যদিকে পাশেই গুলশান এভিনিউয়ের তার নিজের ১৯৬ নম্বর বাসায় থাকছেন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী-কন্যা।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি এই বাসায় (ফিরোজায়) লেগে আছে। যারা বাড়ির সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত তাদের আবেগ-অনুভূতিও উনাকে ঘিরে।
তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছেন, যারা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময়ে বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্যারের ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে ভালোবাসার পরশ নিয়ে এখনো আছেন ফিরোজার চারপাশে। চেয়ারপারসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমিও সেই অনুভূতিটা উপলব্ধি করছি, যা ভাষায় প্রকাশ করার মানসিকতা এই মুহূর্তে আমার নেই।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ) এক সদস্য বলেন, ‘ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) ডিউটি করতাম। আজকে তিনি নেই, পুরো বাড়িটাই খালি।
বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা শূন্যতা, নিস্তব্ধতা কানে আসে। এই কষ্ট ও বেদনার কথা বলার ভাষা নেই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে ভালো রাখেন।’
মায়ের চলে যাওয়ার শোকে আচ্ছন্ন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সারা দিন তিনি দোয়া-দরুদ ও নামাজ পড়ে কাটিয়েছেন।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল রাতে এবং আজকে (বৃহস্পতিবার) বিকেল পর্যন্ত বাসায় ম্যাডামের আত্মার মাগফিরাত কামনায় ইবাদত-বন্দেগিতে ছিলেন। দোয়া-দরুদ, কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। আত্মীয়-স্বজনরা অনেক বাসায় এসেছেন তাঁকে সান্ত্বনা জানাতে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাসা থেকে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে যান তারেক রহমান।’
এদিন গুলশান কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, অফিসে কালো পতাকা উড়ছে। দলীয় ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। দুই দিন আগে খোলা হয়েছে শোক বই। যেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত-প্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদরা শোক বার্তা লিখছেন। এদিন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছিনা দরবার শরিফের পীর মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি শোক বার্তা লিখেছেন।
গুলশান কার্যালয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। যা তার প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসারই প্রতিফলন। এই ভালোবাসার কারণ হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। যিনি তার নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। যিনি তার সমগ্র জীবন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াই করেছেন, কারাভোগ করেছেন। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু কখনো দেশ ছেড়ে চলে যাননি।’
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার দেশের প্রতি ভালোবাসা, মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাই এই মানুষগুলোকে আলোড়িত করেছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে যখন তার অভিভাবকত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই সময় তার চলে যাওয়ায় মানুষ সবচেয়ে বেশি মর্মাহত হয়েছে। সে কারণেই দেশনেত্রীর নামাজে জানাজায় তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় মানুষ সমবেত হয়েছে এবং চোখের পানি ফেলেছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ অন্তত এই আশাটুকু নিয়ে গেছে যে খালেদা জিয়ার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে কর্তব্য রয়েছে, তা তারা পালন করবেন। তারা আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ করে দেশের পক্ষে যে শক্তি, বিএনপি; সেই শক্তিকে বিজয়ী করবে বলে আমি মনে করি। খালেদা জিয়া অনুপস্থিতি আগামী রাজনীতিইতে কোনো প্রভাব পড়বে না, তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে যে ভালোবাসা তৈরি হয়েছে, মানুষের মধ্যে আবেগ কাজ করছে, তা বিএনপিকে আরো বেশি শক্তিশালী করবে।’
এর আগে গত মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বুধবার মানিক মিয়া এভিনিউতে নামাজে জানাজার পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
